রবিবার, ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২০

প্রচ্ছদ > পাঁচমিশালি > আমি কালো এবং আমি সুন্দর: লুপিটা নিয়ং

আমি কালো এবং আমি সুন্দর: লুপিটা নিয়ং

অস্কার বিজয়ী অভিনয়শিল্পী লুপিটা নিয়ং

অস্কার বিজয়ী অভিনয়শিল্পী লুপিটা নিয়ং

অনুবাদ: ইশরাত বিনতে আফতাব

(অস্কার বিজয়ী মুভি ‘টুয়েলভ ইয়ার্স অ্যা স্লেইভ’-এর প্যাটসির কথা মনে আছে? সম্পূর্ণ নতুন আগমনকারী এই কৃষ্ণসুন্দরী লুপিটা নিয়ং জিতে নেন সপ্তম ব্ল্যাক ওমেন ইন হলিউড এর ‘বেস্ট ব্রেকথ্রো পারফর্মেন্স’ অ্যাওয়ার্ড। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে বর্ণবাদ নিয়ে তার নিজের জীবনের কিছু ঘটনা ও পরবর্তী আত্মপোলব্ধির কথা বলেছেন এ বক্তৃতায়।)

‘প্রিয় লুপিটা, আমার মতে তুমি পৃথিবীর অন্যতম সৌভাগ্যবানদের মধ্যে একজন যে কিনা কালো হওয়া সত্ত্বেও হলিউডে রাতারাতি সাফল্য অর্জন করেছো। আমিতো আরেকটু হলেই যে কোনো ভালো নামকরা ব্র্যান্ডের ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম কিনতে যাচ্ছিলাম! কিন্তু কী ভাগ্য দেখ? আমার দৃষ্টিসীমায় তুমি উদয় হলে এই পৃথিবীতে আর আমি বেঁচে গেলাম কিছু অপ্রিয় কাজ থেকে।’ মাঝে মাঝে যখন এমন শব্দগুলো আমার চোখের সামনে আসে তখন নিজের ভেতর অন্যরকমের অনুভূতি কাজ করে। আমি নিজেই বিশ্বাস করতে পারি না এখনো যে আমার প্রথম কাজ এতই প্রশংসনীয় হবে আর কিছু মানুষের জীবনে আশা যোগানোর রসদ হিসেবে কাজ করবে। সবার উদ্দেশ্যে আমি নিজেকে নিয়ে আমার আগের ধারণার কথা বলতে চাই তাহলে হয়তো বুঝতে পারবেন কীভাবে শুধু মানসিক চিন্তাধারণা কারো জীবনে এতো বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। সত্যি কথা বলতে কি, আর দশজন সাধারণ মেয়ের মতো শুধু কালো বলে আমি নিজেও আমাকে অসুন্দর ভাবতাম। আর আশেপাশের মানুষও আমার গায়ের রং নিয়ে আমাকে অনেক নেতিবাচক কথা বলেছে। জীবনের একটা পর্যায় পর্যন্ত স্রষ্টার কাছে আমার শুধু একটাই প্রার্থনা ছিল- কোনো এক জাদুবলে যদি আমার গায়ের রং ফর্সা হয়ে যেত! কত সকাল আমার কেটেছে আয়নার সামনে একবুক হতাশা নিয়ে। আমার ফর্সা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এতই বেশি ছিল আমি স্রষ্টার শর্ত দেওয়ার মতো হাস্যকর কাজও করেছি। আমি প্রার্থনা করতাম যদি আমাকে স্রষ্টা ফর্সা করে দেয় আমি তাহলে আর সুগার কিউব চুরি করবো না, আমি আম্মুর সব কথা শুনবো, আমি আর স্কুলে গিয়ে সোয়েটার হারাবো না ইত্যাদি। আর ভাবতাম হয়তো আমার শর্তগুলো স্রষ্টার পছন্দ হচ্ছে না তাই তিনি আমার কথা শুনছেন না।
এর কিছুদিন পরেই আমার চোখে পড়ে মডেল অ্যালেক ওয়েককে। দেখতে আমার মতই কালো কিন্তু ম্যাগাজিন, পত্রিকাগুলো থেকে শুরু করে রুপালি পর্দার সবাই তাকে সুন্দরী বলে এক কথায় স্বীকার করছেন। আমার কাছে প্রথমে কিছুটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিলো আমার মতো দেখতে একজনকে সবাই কাছে টেনে নিচ্ছে ভালোবাসায় এবং সুন্দরী বলে। যদিও আমি নিজেকে খুব একটা আশান্বিত করতে চাইনি কিন্তু নিজের অজান্তেই আমি তার মধ্যে আমার নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলাম। হঠাৎ করেই আমি আমার মধ্যে এক নতুন “আমি” কে আবিষ্কার করলাম। কেন যেন মনে হল আমি আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছি, কিন্তু তার জন্য আমার মধ্যে ফর্সা হওয়ার প্রয়োজনীয়তা কীভাবে যেন উধাও হয়ে গেছে। যদিও আশেপাশের সবার কাছে আমি হয়তো তখনও অসুন্দর ছিলাম কিন্তু আমার নিজের ভেতর থেকে ফর্সা হওয়ার তাগিদ ফুরিয়ে গিয়েছিল। আমার মা বলতেন, ‘সৌন্দর্য হয়তো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তবে আত্মার পরিতৃপ্তি দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।’ এই কথাগুলো আমাকে প্রায়ই তাড়া করে বেড়াতো। আমার মা বোঝাতে চাইতেন বাহ্যিক সৌন্দর্য তোমাকে আত্মবিশ্বাসী কিংবা দৃঢ় করতে পারবে না। তোমার শক্তি অথবা দৃঢ়তার জন্য প্রয়োজন অন্তরের বা আত্মার সৌন্দর্য। অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর একপর্যায়ে গিয়ে আমি বুঝতে পারি যে সৌন্দর্য অর্জন করার মতো কিছু নয়, সৌন্দর্য সম্পূর্ণ অন্তর্নিহিত একটি বিষয়।
আমি আশা করবো আমার উপস্থিতি এই ম্যাগাজিন এবং সকল তরুনীর সফল যাত্রাপথের পাথেয় হবে। তোমরাও নিজেদের বাহ্যিক সৌন্দর্যের সাথে সাথে নিজেদের অন্তরাত্মার সৌন্দর্যের প্রতিও সচেতন হবে।

পাঠকের মন্তব্য

আপনার ই-মেইল অপ্রকাশিত থাকবেবক্সটি পূরণ করুন *

*

Pin It on Pinterest

Shares
Share This