শুক্রবার, অক্টোবর ২০, ২০১৭

প্রচ্ছদ > কলেজ ক্যাম্পাস > পৃথিবীর বুকে আমরা

পৃথিবীর বুকে আমরা

 

su (2) - Copy

বিমানবন্দরে বাংলাদেশ দল। লেখক ডান থেকে তৃতীয় ।

শাকিল রেজা ইফতি :

গিনেস রেকর্ড অনুসারে পৃথিবীর সব থেকে বড় স্কুল হল ভারতের লাখনাউয়ের সিটি মন্টেসরি স্কুল। স্কুলটি প্রতিবছরই অনেকগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। এগুলোতে অংশ নেয় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা। চলতি মাসের ১৭ থেকে ২০ নভেম্বর সিটি মন্টেসরিতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিজ্ঞান বিষয়ক প্রতিযোগিতা ‘কোয়ান্টা’। এটা ছিল কোয়ান্টার ২২ তম আসর, যেখানে অংশ নিয়েছে ৩৩টিরও বেশি আন্তর্জাতিক দল। পাশাপাশি ভারতের স্থানীয় দলগুলো তো আছেই। আমার সুযোগ হয়েছিল লাল সবুজের পতাকা হাতে একটি আন্তর্জাতিক দলের সদস্য হিসেবে সেখানে যাওয়ার। ভেতরে ভয় ছিল। এতো এতো দেশের শিক্ষার্থীদের মাঝে নিজের স্বকীয়তা বৃথা যাওয়ার ভয়। কিন্তু যখন অনুভবে টের পেয়েছি আমার পরিচয়, তখন সাহস পেয়েছি। আমার পূর্বপুরুষের রক্তের ঘ্রাণ যখন আমার স্বাধীনতা অর্জনের সাক্ষী, বুকভরা সাহস যখন বাংলার কোটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার হাতিয়ার, তখন পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোতে ভয় কিসের? নাই নাই ভয়। শুধু ছিল বিস্ময়। কত্ত বড় আয়োজন! কতো কতো গাঁদা ফুলের মালা! কতো কতো দেশের প্রতিযোগী! কী নাম ওদের? কোথায় ওদের দেশ? কী ওদের পরিচয়? লাখনাউ বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর থেকেই আমার ভেতরে শুরু হল এক দারুন ঝড়- নতুনকে জানার, নিজেকে নতুনের সামনে তুলে ধরার।

su (3)

বিমানবন্দর থেকে আমাদের রিসিভ করতে এসেছিলেন সিটি মন্টেসরি স্কুলের একজন শিক্ষক ও দুইজন শিক্ষার্থী। আমাদের দলে আমরা ছিলাম সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭ জন শিক্ষার্থী ও ১ জন শিক্ষক। দুইটি গাড়িতে করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল সিটি মন্টেসরি স্কুলের চক ক্যাম্পাসে। ক্যাম্পাসের সবুজ ঘাসের ওপর বিছানো লাল গালিচার উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের জন্য নির্ধারিত গেস্টহাউজের কক্ষে। দলের সবার মাঝেই তখন উত্তেজনা কাজ করছে। আমাদের টিম লিডার সম্মানিত শিক্ষক অ্যান্থনি প্রিন্স কস্তা স্যার সেদিন রাতেই আমাদেরকে পুরো ইভেন্টের নিয়মকানুন ভালোভাবে বুঝিয়ে দিলেন। স্কুলের ক্যান্টিনে রাতের খাবার সেরে সেদিনের মতো ঘুমিয়ে পড়লাম সবাই।

পরদিন ঘুম থেকে উঠেই আমরা উপস্থিত হলাম স্কুলের মূল অডিটোরিয়ামে। সেখানে প্রেস কনফারেন্স ও মর্নিং প্রেয়ারের আয়োজন করা হয়েছিল। তারপর সবাইকে প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ইভেন্টের সময় জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এক কথায় খুব সাজানো-গোছানো ওরা। সময়ের ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন।

প্রতিযোগিতার মূল ইভেন্টগুলোর সময়সীমা ছিল বলতে গেলে অনেক অল্প। সব চেয়ে বেশি সময় ছিল আমার ভেতরে চলতে থাকা সেই ঝড়কে শান্ত করার জন্য। অর্থাৎ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সাথে নিজেদের সংস্কৃতি বিনিময়ের জন্য। অনেক আড্ডা দিয়েছি। গল্প করেছি অনেক। শিখেছি অনেক কিছু। একে অপরের ফেইসবুক আইডি বিনিময় করেছি। জার্মান দলের কোন প্রতিযোগীরই ফেইসবুক আইডি না থাকার বিষয়টা আমাদের সবাইকে খুব অবাক করেছে। হাহাহা। নেপাল, ব্রাজিল, ভারত ও মালয়েশিয়ার দলের সাথে আমরা এমনভাবে মিশে গিয়েছিলাম যেন সবাই একটি সীমান্তের ভেতর থেকেই এসেছি। আমাদের সার্বিক সহায়তার জন্য সেচ্ছাসেবক হিসেবে নিযুক্ত ছিল সিটি মন্টেসরি স্কুলেরই এক ঝাঁক শিক্ষার্থী। তারা ছিল এক কথায় অসাধারণ। সেখানকার ডিজে পার্টিতে সব দেশের শিক্ষার্থীরা একত্রে মিলে মিশে নেচেছে। মজা করেছে। সেই মিলনমেলায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। খুব সম্ভব জীবনে প্রথম কোন ডিজে পার্টিতে আমি নেচেছি সেখানে। এই আনন্দের মধ্য দিয়ে যেন পৃথিবীর নতুন একটি প্রজন্ম নিজেদের মাঝে একাত্মের বন্ধন গড়ে তুলল।

su (4)

প্রতিদিন মর্নিং প্রেয়ার শেষে সিটি মন্টেসরি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা গান্ধী স্যার এক ঘণ্টা সময় ধরে ওয়ার্ল্ড ইউনিটির উপর ক্লাস নিতেন। তার চিন্তা-ভাবনা-দর্শন আমাদের সবার হৃদয়কে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

যাহোক, মূল ইভেন্টগুলোর মধ্যে ছিল বিতর্ক, রোবট রেস, নৌকা রেস, মানসিক দক্ষতা যাচাই, ম্যাথ কুইজ, সাইন্স কুইজ ইত্যাদি। আমাদের দল ম্যাথ কুইজে ২য় স্থান অর্জন করে। দলের সাদিদ ভাইয়া ও ইরাম পুরস্কার নেওয়ার সময় চিৎকার করে বলেছিল- ‘জয় বাংলা!’ এক অন্যরকম অনুভূতি আঁকড়ে ধরেছিল আমাদের প্রত্যেককে।

অনুষ্ঠানের শেষের দিন স্টেজে প্রতিটি দেশ নিজ নিজ সংস্কৃতি তুলে ধরেছিল। আমার সুযোগ হয়েছিল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রেজেন্টেশনটা পুরোপুরি সাজিয়ে উপস্থাপন করার। সেখানে আমরা কবিতা আবৃত্তি করেছি, গান গেয়েছি। হল ভর্তি এতো এতো বিদেশির সামনে লাল সবুজের পতাকাটা পতপত করে উড়িয়েছি। সকলে মুখরিত হয়েছে করতালিতে। আমার চোখের কোণে এক ফোটা জল অনুভব করেছি। গর্বের জল। আনন্দাশ্রু।

লেখক একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত, সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

পাঠকের মন্তব্য

আপনার ই-মেইল অপ্রকাশিত থাকবেবক্সটি পূরণ করুন *

*

Pin It on Pinterest

Shares
Share This